মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ওয়াল স্ট্রিটে টানা ৫ সপ্তাহ দরপতন

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।

এক মাস ধরে চলা সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে। গত শুক্রবার লেনদেন শেষে বড় পতন হয়েছে ওয়াল স্ট্রিট সূচকের। এর মাধ্যমে টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে দরপতনের বৃত্তে আটকে রইল মার্কিন পুঁজিবাজার, যা চার বছরের মধ্যে দীর্ঘতম নেতিবাচক ধারা হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর এপি।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এটিই ছিল বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। তাই যখন ওয়াল স্ট্রিটে ধস নামে, তখন এটি বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করে।

লেনদেন শেষে শুক্রবার দেখা যায়, মার্কিন বাজারের প্রধান তিন সূচকই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। বাজারের প্রধান সূচক হিসেবে পরিচিত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ১ দশমিক ৭ শতাংশ বা ১০৮ দশমিক ৩১ পয়েন্ট হারিয়েছে। দিন শেষে সূচকটি ৬ হাজার ৩৬৮ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে স্থির হয়। গত জানুয়ারিতে অর্জিত সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচকটি এখন ৮ দশমিক ৭ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ সূচকটি প্রায় ৭৯৩ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৪৫ হাজার ১৬৬ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে। গত মাসে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছার পর থেকে এ পর্যন্ত ডাও জোন্স ১০ শতাংশের বেশি পয়েন্ট হারিয়েছে। প্রযুক্তি খাতের প্রাধান্য থাকা নাসডাক কম্পোজিট সূচক শুক্রবার ২ দশমিক ১ শতাংশ বা ৪৫৯ দশমিক ৭২ পয়েন্ট কমে ২০ হাজার ৯৪৮ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে ঠেকেছে।

বিনিয়োগকারীদের ভাষায়, যখন কোনো সূচক রেকর্ড উচ্চতা থেকে ১০ শতাংশের বেশি পড়ে যায়, তখন তাকে ‘কারেকশন’ বা দর সংশোধন বলা হয়। ডাও জোন্স ও নাসডাক উভয়ই বর্তমানে এ পরিস্থিতির শিকার।

মার্কিন শেয়ারবাজারের চিত্র সপ্তাহজুড়ে ছিল অনেকটা পেন্ডুলামের মতো। যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে সূচকগুলো প্রতিদিন একবার বাড়ছে তো পরক্ষণেই কমছে। বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধ হওয়ার পর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। তিনি ইরানকে দেয়া একটি সময়সীমা আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের শর্ত ছিল, ইরানকে পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের পূর্ণ অনুমতি দিতে হবে। অন্যথায় ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় হামলা চালানোর হুমকি দেন তিনি।

ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও শুক্রবার এশিয়া ও ইউরোপের বাজার ঘুরে যখন লেনদেন আবার ওয়াল স্ট্রিটে ফিরে আসে, তখন তেলের দাম পুনরায় বাড়তে শুরু করে।

ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম শুক্রবার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলার ৩২ সেন্টে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এ তেলের দাম ছিল ৭০ ডলারের কাছাকাছি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভিন্ন ঘোষণা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে লড়াই থামার কোনো লক্ষণ দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকরা। ইরান নতি স্বীকার করতে নারাজ, আর ইসরায়েলও হামলার পরিধি বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে।

ওয়েলস ফারগো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট ডগ বিথ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক অসামঞ্জস্য বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। সপ্তাহের শেষে এসে যুদ্ধের ঘনঘটায় বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা পুরোপুরি ধসে পড়েছে।

ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজিস্ট জিম বিয়ানকো মনে করেন, ট্রাম্পের সমঝোতাবিষয়ক কোনো বক্তব্যই এখন বাজারে প্রভাব ফেলতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘‌শুধু ইরান যদি আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে কোনো ইতিবাচক কথা বলে, তবেই বাজার তা গ্রহণ করবে।’

বিনিয়োগকারীদের প্রধান ভয় হলো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতির এক ভয়াবহ ঢেউ আছড়ে পড়বে। এটি কেবল যাতায়াত খরচ বাড়াবে না, পণ্য পরিবহনে জাহাজ বা ট্রাক ব্যবহারকারী সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত ভার বইতে হবে সাধারণ মানুষকে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্য বা শৌখিন খাতের শেয়ারদর সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খাচ্ছে। কারণ তেলের দাম বাড়লে মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ কমে যায়। এদিকে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম ও যুদ্ধের অনিশ্চয়তা মার্কিন সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের এক জরিপে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে সাধারণ মানুষের খরচ করার মনোভাব অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি কমেছে।

আরও